হাম (Measles) রোগ হলে করণীয়: লক্ষণ, যত্ন এবং দ্রুত সুস্থতার উপায়
হাম বা মেজেলস (Measles) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত প্যরামিক্সোভাইরাস (Paramyxovirus) নামক ভাইরাসের সংক্রমণে হয়ে থাকে। সাধারণত শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়, তবে যেকোনো বয়সের মানুষেরই হাম হতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক যত্ন ও চিকিৎসা না নিলে হাম থেকে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আজকের নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব হামের লক্ষণ, রোগ হলে তাৎক্ষণিক করণীয়, ঘরোয়া যত্ন এবং কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
হামের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ
হামের ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে প্রায় ১০ থেকে ১৪ দিন সময় লাগে। প্রাথমিক লক্ষণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
* উচ্চ জ্বর: আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর হঠাৎ অনেক গরম হয়ে যেতে পারে (১০১° থেকে ১০৪° ফারেনহাইটে উঠতে পারে)।
* সর্দি ও কাশি: নাক দিয়ে পানি পড়া, অনবরত হাঁচি এবং শুকনো কাশি হতে পারে।
* চোখ লাল হওয়া: চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং আলোতে অস্বস্তি (Photophobia) হওয়া।
* কপলিক স্পট (Koplik's spots): গালের ভেতরের অংশে বা মাড়িতে ছোট ছোট সাদা বা লালচে দাগ দেখা যেতে পারে।
* শরীরে লালচে র্যাশ (Rash): জ্বর আসার ৩ থেকে ৪ দিন পর কান ও মুখের চারপাশ থেকে লালচে গুটি বা র্যাশ ওঠা শুরু করে এবং আস্তে আস্তে তা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
হাম রোগ হলে করণীয়: ৯টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
হাম হলে আতঙ্কিত না হয়ে ঘরোয়া উপায়ে সঠিক যত্ন নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
১. আক্রান্ত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে (আলাদা) রাখা
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। এটি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়।
* আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা ঘরে রাখুন।
* শিশু, গর্ভবতী নারী এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম—তাদের রোগী থেকে দূরে রাখুন।
* কমপক্ষে র্যাশ বের হওয়ার পর থেকে ৪-৫ দিন সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে।
২. প্রচুর পানি ও তরল খাবার প্রদান
জ্বর ও ঘামের কারণে শরীরে তরল পদার্থের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
* রোগীকে প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ পানি, ডাবের পানি, তাজা ফলের রস, এবং স্যুপ খেতে দিন।
* শিশু যদি বুকের দুধ পান করে, তবে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
৩. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা
শরীরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন। সম্পূর্ণ বেড রেস্টে (Bed rest) থাকতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় কায়িক পরিশ্রম বন্ধ রাখতে হবে।
৪. চোখের যত্ন ও ঘর অন্ধকার রাখা
হাম হলে চোখ আলো সহ্য করতে পারে না (Photophobia)।
* রোগীর ঘরের আলো কিছুটা কম বা হালকা রাখুন।
* সরাসরি রোদ বা কড়া আলো ঘরে আসতে দেবেন না।
* টিভি, মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখুন।
* পরিষ্কার ভেজা সুতি কাপড় দিয়ে চোখ আস্তে আস্তে মুছে দিন।
৫. জ্বর কমানোর উপায়
* চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রায় প্যারাসিটামল (Paracetamol) জাতীয় ওষুধ দেওয়া যেতে পারে।
* সতর্কতা: শিশুদের কোনো অবস্থাতেই অ্যাসপিরিন (Aspirin) দেওয়া যাবে না, কারণ এতে "রেইস সিন্ড্রোম" (Reye's syndrome) নামক মারাত্মক জটিলতা হতে পারে।
৬. ভিটামিন-এ (Vitamin A) সেবন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ালে চোখের ক্ষতি এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
৭. সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া
* নরম, সহজে হজম হয় এমন খাবার (যেমন: জাউ ভাত, সবজি সিদ্ধ, নরম খিচুড়ি) দিন।
* বেশি মশলাযুক্ত বা অতিরিক্ত তেল-ঝাল খাবার এড়িয়ে চলুন।
৮. ত্বকের যত্ন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
* র্যাশ চুলকালে ত্বকে ঘা হতে পারে। তাই রোগীর হাতের নখ ছোট করে কেটে রাখুন।
* কুসুম গরম পানিতে সুতি কাপড় ভিজিয়ে শরীর হালকা করে মুছে দিন।
* ত্বক বেশি শুষ্ক হয়ে গেলে ডাক্তারের পরামর্শে ক্যালামাইন লোশন (Calamine Lotion) ব্যবহার করা যেতে পারে।
৯. অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা
যেহেতু হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক এতে কাজ করে না। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কখনোই নিজে থেকে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না।
কখন জরুরিভিত্তিতে ডাক্তারের কাছে যাবেন?
হামের কারণে অনেক সময় মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্ত দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে:
* শ্বাসকষ্ট বা বুক দেবে যাওয়া।
* একটানা তীব্র জ্বর না কমা।
* মারাত্মক মানসিক অসাড়তা, ঝিমুনি বা খিঁচুনি হওয়া।
* কান দিয়ে পুঁজ বা পানি পড়া (কানের ইনফেকশন)।
* তীব্র ডায়রিয়া বা পানিশূন্যতা দেখা দেওয়া।
* চোখে অতিরিক্ত ইনফেকশন বা দেখতে সমস্যা হওয়া।
হাম প্রতিরোধের সেরা উপায়: টিকাদান (Vaccination)
হাম থেকে বাঁচার একমাত্র ও সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ইপিআই (EPI) শিডিউল অনুযায়ী এমআর (MR) বা এমএমআর (MMR) টিকা দেওয়া।
* শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ (MR Vaccine) এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয়।
* সঠিক সময়ে টিকা নিশ্চিত করলে হামের আক্রমণ থেকে শিশু শতভাগ নিরাপদ থাকে।
1. রোগীকে আলাদা ঘরে রাখুন
সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্তত ৫ দিন বাকি সদস্যদের থেকে আইসোলেশনে রাখুন।
2. প্রচুর তরল ও পানি পান করান
পানিশূন্যতা দূর করতে ডাবের পানি, ওআরএস (ORS), ফলের রস এবং নরম খাবার দিন।
3. প্যারাসিটামল ও ভিটামিন-এ নিশ্চিত করুন
জ্বর নিয়ন্ত্রণে প্যারাসিটামল এবং চোখের সুরক্ষায় ডাক্তারের পরামর্শে ভিটামিন-এ দিন।
4. জরুরি জটিলতায় ডাক্তারের পরামর্শ নিন
শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা কানের কোনো সমস্যা হলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।
> বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি সাধারণ সচেতনতার জন্য তৈরি করা হয়েছে। হামের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা শুরু করুন।
>

